পরীক্ষামূলক প্রকাশনা - সাইট নির্মাণাধীন

Home > শিল্প ও সাহিত্য > ঢাকার বইমেলা : মোদের গরব মোদের আশা

ঢাকার বইমেলা : মোদের গরব মোদের আশা

মো: মাইনুল হাসান:

বইমেলা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। ঢাকার বইমেলা আকারে বিশালতায় বেশ বড় একটা জায়গা দখল করে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্যোগে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বড় হওয়া আজকের বইমেলা চারিত্রে একেবারেই ভিন্ন।

এর গায়ে একদিকে যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া আরেকদিকে তার মাটিতে আছে রক্তের দাগ। বাংলা একাডেমির এই বইমেলা একাডেমির আর সকল কাজের মত কোথাও না কোথাও কিছু ভুল আর ভ্রান্তির পরিচয় রেখেই এগুচ্ছে। যেদেশে যেসমাজে সবকিছু হয় গোঁজামিল অথবা আপোষের   গন্ডিতে বিকৃত সেখানে আমরা নিশ্চই কোনো একটি মেলাকে আদর্শ ও ভালোবাসার শীর্ষে দেখব না। তারপরও এই বইমেলা এখন পদ্মাপাড়ের লেখক-লেখিকা ও পুস্তকপ্রিয়দের তীর্থভূমি। আজ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিস্তৃত পরিণত বইমেলা শুধু ছাড়ের দৃষ্টি বা তোষামোদ দাবি করেনা। এর সাথে আছে আমাদের প্রত্যাশার কিছু অনিবার্য বিষয়।

একটা জরুরি বিষয় মনে রাখা উচিৎ, মেলাকে কেন্দ্র করে বই, না বইকে কেন্দ্র করে মেলা? এটা মানতে হবে যত প্রকাশনা বাড়বে তত মঙ্গল। দেশের আনাচে কানাচে লেখক-লেখিকারা সারা বছর এজন্যে প্রস্তুত হয়ে থাকে। কত নবীন, তরুণ, তরুণীর জন্ম হয় এই মেলাকে ঘিরে। তার মূল্য কী  সামান্য? কালের বিচারে কে টিকবে কে টিকবে না তার কথা মনে রাখলে লেখার জগত এগুতোনা। এমনিতেই  আমাদের দেশে সমস্যার অন্ত নেই। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও বাস্তবতা আজ অনেক দূরের দুই প্রতিবেশী। আমাদের তরুণরা আছে মহাবিভ্রান্তিতে। সরকার ও দেশ- মুখে যত চেতনার কথাই বলুক তার মাথায় এখন ধর্মের পোকা। এদেশে এমন দ্বৈত ভাবনা আগে দেখিনি। যারা কবি তারা আজ ধার্মিক হবার বাসনায় উগ্র। যারা লেখক যারা সুশীল তাদের অন্তর স্বয়ং খোদাও পড়তে পারেন না। যারা বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন তারা রমাদানে উপোসের উপকারিতা বয়ানে মুখিয়ে। সমাজের কোথাও অগ্রসরতার একটা চিহ্ন দেখা গেলে তাকে গিলে খেতে চায় দশটা দানব। তরুণরা কী  করে জানবে কোনটা আসলে ঠিক বা আসল চেহারা? তরুণীদেরতো আরো বিপদ। কবিতা লিখলে তারা সমাজ সংসারে কতটা অপমাণিত হতে পারে সেটাও ভাবাও কঠিন। তরুণীদের আরো বিপদ। আজকাল মা-বাবারাও চান না মেয়েরা তাদের জীবনে অশান্তি টেনে আনুক। তারপর ও আমাদের নারীরা বই মেলার এক বিশাল অংশজুড়ে আছেন। বিষয় হচ্ছে তাদের নিরাপত্তা আর তাদের সামনে যাবার পথ সুগম রাখা। মনে হয় না সেদিকটা নিবে বাংলা একাডেমির তেমন কোনো ভাবনা আছে। আর থাকলেও কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানা যায় না।

আমি যেদেশে থাকি সেখানে বুক ফেয়ার বলে একটা বিষয় চালু আছে। পার্থক্য এই এরা বছরে একবার করে না। নানা কারণে নানা উৎসবে নানা আমেজে তা ঘটতেই থাকে। বই মেলাকে কেন্দ্র করে দেশ জাগিয়ে তোলার যেমন হঠাৎ কোনো আয়োজন নাই, তেমনি বই বাদ দিয়ে সারা বছর চলাও জানে না এরা। আমাদের ধারণা বই মানে গল্প কবিতা কিংবা প্রবন্ধের কিছু একটা। খুব জোর দু-একটা অনুবাদ গ্রন্থ। এদেশে তো তা না। কে কোথায় বেড়াতে যাবেন কেন যাবেন তার জন্যে আছে ঢাউস যত বই। এসব ট্র্যাভেল গাইডের কাহিনী ও ধরণ উপন্যাসের মতো। আগে ভাবতাম কি দরকার? এখন আমিও এর প্রেমে পড়ে গেছি। ভিয়েতনাম যাবো আর কি খাবো কোথায় যাবো তা জানবো না? যাবেন বলিভিয়া, কে আপনাকে জানাবে চের কাহিনী? কি করে জানবেন কিউবার ইন্টারনেটের স্পিড কতো? কোনদেশে কোন মুদ্রার চলন কম্বোডিয়ায় যে এটিএম থেকে হুড়মুড় করে আমেরিকান ডলার বেরোয় সেটা জানতাম কি করে? এদেশে লাইফস্টাইলের অধীনে যেসব বই চলে সেগুলোও বেশ মজার। চুল খাড়া রাখা বা চুল কাটার ফ্যাশন থেকে শুরু করে আপনার আগামী বছরের রাশিফলের বইও প্রায় সাহিত্য ছুঁই ছুঁই টাইপের। আমরা এগুলোকে জাতে তুলিনি। অথচ এর প্রয়োজনীয়তা ও বৈচিত্র্য মনকাড়া। দেশে সবচেয়ে অবহেলিত বিজ্ঞান। বিজ্ঞান বিষয়ক কল্পকাহিনীর স্রষ্টাকে আমরা কলাম লেখক বানিয়ে ছেড়েছি। জয়বাংলা থেকে রাজাকার সব বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এখন আর কেউ এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। আমাদের যৌবনেও আমরা রহস্য কাহিনী আর বিজ্ঞানের কল্পনায় বুঁদ ছিলাম। চিকিৎসা শাস্ত্রের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কটা বই বাজারে আসে? মনে পড়ছে চেক দেশীয় এক অধ্যাপকের কথা। যিনি বলে্লেছিন, আপনারা একুশের ভাষার সংগ্রামে উদ্দীপ্ত জাতি। এনিয়ে গর্ব করেন ঠিকই, কিন্তু সব বিষয়ে এখনো মাতৃভাষায় পুস্তক নাই আপনাদের। তাদের ঐটুকু একটি দেশ। অল্প মানুষ। তারপরও আপনি আকাশ বিজ্ঞান থেকে সমুদ্রবিদ্যা যাই বলেন না কেন তারা চেক ভাষায় লিখিত বই এনে দিতে পারবে। এর নাম সর্বজনীনতা।

বিচিত্র পথের মুখ বন্ধ করে আপনি যদি মাইক হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর যাকে পাবেন তাকেই বলেন, কেমন লাগছে বইমেলা? কোনো ফায়দা আছে কি আসলে? মিডিয়ার এক ধরনের বালকসুলভ চপলতা দেখি আমরা। যেন একুশের সব চেতনা আর ভালোবাসার দায় নিয়েছে বাংলা একাডেমির বইমেলা। জীবনের যেসব এলাকায় এখনো অন্ধকার আর অজ্ঞানতার ভিড় তার বিহিত না করে এসব আনন্দের মানে কোথায়? এই সেদিনও আমরা দেখলাম স্টল বরাদ্দ নিয়ে কত ঘটনা। কোন প্রকাশক কখন কোথায় কী বিষয়ে মত প্রকাশ করেছিলেন, তার শাস্তি হিসেবে তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে একহাত নেবার আদিমতম জিঘাংসা মনে করিয়ে দেয় সভ্য হবার চর্চা এখনো কতটা জরুরি। রাজনীতি দেশে এমন এক বিষয় চাইলেও আপনি এর বাইরে থাকতে পারবেন না। সে রাজনীতি বইমেলাকে রক্তাক্ত করে ছেড়েছে। আমরা এখানেই হারিয়েছি এদেশের শক্তিমান লেখক হুমায়ুন আজাদকে। আমাদের চোখের সামনে খুন হয়েছেন মুক্তচিন্তার লেখক অভিজিৎ রায়। সে বেদনা সে কষ্ট ভোলার নয়। লেখকের মগজ পড়ে থাকা ফুটপাতের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া এদেশের তরুণ-তরুণীদের মনে কী এই প্রশ্ন জাগবে না তারা আসলে কতটা নিরাপদ?

বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি এভাবে চলতে থাকে, যদি এভাবে ঢাকা পড়ে যায় অপরাধ, কোনো বইমেলাই আমাদের জাতিকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারবে না। মাঝে মাঝে দূর থেকে মনে হয় আর দশটা নিয়ম ও উৎসবের মত হয়ে উঠছে এই মেলা। ভালোমন্দ শক্তি অপশক্তি মিলিয়ে এক ধারাবাহিক পরিক্রমা। তারপরও যখন দেখি নতুন বই হাতে একটি কিশোর বা কিশোরীর উজ্জ্বল মুখ, যখন দেখি মা জননী গলদগর্ম হয়ে খুঁজছেন সন্তানের প্রিয় বইটি, বয়স্ক রিটায়ার্ড মানুষটি ফিরে যাচ্ছেন প্রিয় লেখকের অটপগ্রাফ সম্বলিত বই নিয়ে আমরা আশায় বুক বাঁধি। আমরা বুঝি ঢাকা তথা বাংলাদেশ মাথা নত করতে জানেনা। তাই আমাদের এই প্রিয় বইমেলাকে ঘিরে স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বাড়তেই থাকে। হয়তো একদিন এর হাত ধরেই জেগে উঠবে নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা।

x

Check Also

এই যে ম্যাডাম ? ওড়না কোথায় ?

এই যে ম্যাডাম ? ওড়না কোথায় ? মাইনুল হাসান এই যে ম্যাডাম ? ওড়না কোথায় ? বুকটা কেন খালি ? ইভটিজারে শিঁস মারিলে, তখন তো দেন গালি । চুপ বেয়াদব ! বলিস কীসব ? ঘরে ...

একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ বিশিষ্ট ব্যক্তি

সচিবালয় প্রতিবেদক : বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৮ সালের একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ বিশিষ্ট ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই পদকের জন্য মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ...

পুঠিয়ার প্রবীণ সাহিত্যিক আবদুল মজিদ মন্ডল আর নেই

পুঠিয়া প্রতিনিধি: রাজশাহীর পুঠিয়ার প্রবীণ কবি ও সাহিত্যিক আবদুল মজিদ মন্ডল আর নেই ইন্নাল্লিাহে…..রাজিউন। রবিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশাষ ত্যাগ করেন। ...

শিরোনামঃ