পরীক্ষামূলক প্রকাশনা - সাইট নির্মাণাধীন

Home > শিল্প ও সাহিত্য > “উদাসীনি”

“উদাসীনি”

*ভরদুপুরে গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিল সেই মেয়েটি। নাম টা তার আকাশী না বাতাসী তা ঠিক মনে পড়ছে না।অাচ্ছা, তার নামটা দিলাম বাতাসী। মেয়েটি কখনও চায় না ঘরে বসে থাকতে। যখন তখন মন চায় গ্রামের আনাচে-কানাচে ছুটে বেড়াতে, দিগন্তবিস্তৃত মাঠের হলদে সরিষা ক্ষেতের সোনালী আভায় নিজেকে লুকিয়ে রাখতে। আর মন চায় চলে যেতে সেই নীলাঞ্জনা নদীটির তীরে যেখানে সে তার ছোটবেলার খেলার সাথী ও যৌবনের প্রেমিক জীবরান কে চিরতরে হারিয়েছিল। বার বার বাতাসী সেই নদীতীরে ছুটে যায়। সেই পাল তোলা ডিঙি নৌকাটা আজও আগের মত একই জায়গাতে রয়ে গেছে। যেটাতে করে সে আর জিবরান প্রতিদিন বিকালবেলা যেতো নৌকা ভ্রমনে। নদীতে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যেতো কোন দূর অজানায়। আজ জিবরানের কথা মনে পড়লে বাতাসীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠে। শূন্য খাঁ খাঁ মনটা হু হু করে কেঁদে উঠে।এই নদীতে ই সে জীবরানের সলিল সমাধি ঘটতে দেখেছে কিন্তু সে ওর জন্য কিছুই করতে পারেনি। তার চোখের সামনেই জীবরান তার জন্য পদ্ম তুলতে গিয়ে চিরতরে পদ্মফোটা জলের মধ্যে তলিয়ে গিয়েছিল। তখন থেকেই বাতাসী একপ্রকার উন্মাদ হয়ে যায়। যখন তখন নদীর ধারে ছুটে যায়, ছুটে যায় সেই পুরাতন বটতলায় যেখানে জীবরান তার প্রতিক্ষায় বসে মোহিনী সুরে বাঁশি বাজাতো। কিন্তু না, কোথাও সে আর তার ভালোবাসার মানুষ টাকে দেখতে পায় না। তার এ অবস্থা দেখে গাঁয়ের অনেকে বলে সে পাগলিনী হয়ে গেছে । আবার কেউ কেউ বলে যে সে এক উদাসীনি। সঙ্গীর বিরহে আজকে তার এই দশা। গ্রামের অনেক লোকেরাও তার এ অবস্থা দেখে বিলাপ করে। কি সুন্দর হাসিখুশি বন্ধুভাবাপন্ন চঞ্চলা মেয়েটা হঠাৎ ই এমন করে বদলে গেল! এখন কারও সাথেই মিশতে চায়না, কথা বলতে চায়না। সখিদের সাথে হা-ডু ডু খেলতে,বা তেঁতুল কুড়াতে অথবা কাশফুল আনতেও যায়না। শুধু বটতলা, নদীতীর বা সরিষা ক্ষেতেই তার দিন কাটে। খাওয়া দাওয়াতে ও তার কোন আগ্রহ নেই। সারাদিন ছুটাছুটি করে শেষে যখন ঘরে ফিরে তখন মা ও ফুপি জোর করে তাকে কিছু খাওয়ান।অন্যথায় না খেয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।এভাবে কিছুদিন থাকার পর তার দেহটা শুকিয়ে একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গেলো। মা বাবা,সখি, বড়বোন ও ফুপি সবাই তাকে অনেক করে বুঝালেন,যে চলে গেছে সে তো আর কখন ও ফিরবেনা। তাহলে কার জন্য সে দিনের পর দিন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে উদাসীনির মতো পড়ে থাকে? কিন্তু না,বাতাসী এখনও সেই আগের মতই নির্বিকার। ও আজও ছুটে যায় সেই নীল নদীতটে, কখনও যায় তার মফিজ কাকার বাসায়।কারণ উনি আর তার ছেলেরা মিলেই তো জীবরানের প্রাণহীন নিথর দেহটা নদী থেকে তুলে এনেছিলেন।দাফন টাও হয়েছিল তাদেরি পারিবারিক গোরস্থানে। সেদিন জীবরানের লাশটা দাফনের সময় বাতাসী পাথরের মুর্তির মত পাশের বেলগাছটার নিচে সটান দাড়িয়ে ছিল।তার মুখে ছিলনা কোন আর্তনাদ,চোখে ছিলনা কোন অশ্রু।তার এ নির্বিকার ভাবমুর্তি দেখে অনেকেই অবাক হয়ে গিয়েছেন।বারে, প্রেমিক মারা গেল অথচ মেয়েটার চোখে একফোটা পানিও নেই!! কি শক্ত জানরে বাবা! অনেকে আবার উদাসীনির মনের কথা কিছুটা বুঝতেও পেরেছিলেন। কারণ, জীবরান শুধু বাতাসীর প্রেমিক ই ছিলনা তার সেই ছোটবেলার সুখদুঃখের সাথীও সে-ই ছিল। তাই ওর মৃত্যুতে বাতাসীর মনটা শোকে একেবারে পাথর হয়ে গেছে। সেজন্য সে আর কাঁদতে পারছে না।যেদিন ওরা জীবরানকে দাফন করেছিল সেদিন থেকেই হাসিখুশি চঞ্চলা বাতাসী গুটিয়ে সুটিয়ে একেবারেই উদাসীনি গম্ভীর হয়ে গেছে।এই কয়েকদিনে গ্রামের সবাই তাকে উদাসীনি নামেই চিনে। এখন তার কাজ শুধু দিনে পুরো গ্রামে ঘুরে বেড়ানো ও রাত হলেই খাওয়া দাওয়া তেমন একটা না করেই ঘুমিয়ে পড়া।
আর ঘুমিয়ে পরার পরই তার মনে কয়েক ঘণ্টার জন্য সুখের চৈতি হাওয়া দোলা দিয়ে যায়। কারণ, যখন সে নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তখনই জীবরান এসে তার স্বপ্নে দেখা দেয়। আর বলে তুমি কেমন আছ বাতাসী? আমার জন্য ভেবনা,আমি অনেক ভালই আছি। তুমি শুধু তোমার নিজের দিকে খেয়াল রেখ। তুমিতো আবার অনেক চঞ্চলা ছিলে।আচ্ছা, এখন তুমি অমন শুকিয়ে গেলে কেন বাতাসী? নিশ্চয় ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করো না, নিজের যত্ন নাও না। তাই না?আমার জন্য কি তুমি নিজেকে এভাবেই শেষ করে দেবে? তা কি হয়? আরে পাগলী আমিতো সবসময় তোমার পাশেই আছি। তুমি কি তোমার অস্তিত্বে আমাকে অনুভব করো না? তোমার সামনে না থাকলেও আমি সেই সোনালী সরিষা ক্ষেত, নীলাঞ্জনা নদী, বটের ছায়া সবখানেই মিশে আছি। যখন তুমি সরিষা ক্ষেতে ঘুরতে যাও সেখানে আমারই অবয়ব দেখতে পাবে।আমি হারিয়ে যাইনি বাতাসী। আমি এখনও তোমার পাশেই আছি,এখনও আমি তোমাকেই ভালবাসি। তবে, কথা দাও আর কখনও তুমি এমন মনমরা উদাসীনি হয়ে থাকবে না?তুমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুলবে।তুমি না বলতে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। গ্রামের অসহায় নিরীহ মানুষদের সেবা করবে?তাহলে সেই তুমি কি এমন উদাসীনি হয়ে থাকলে চলবে বলো?আমি তো ছায়া হয়ে তোমার সাথেই আছি। তোমার নিঃশ্বাসে, তোমার অস্তিত্বের মধ্যেই আমি মিশে আছি। তুমি আমাকে দেখতে পাওনা তো কি হয়েছে। আমি ঠিকই তোমাকে দেখতে পাই। তুমি কোথায় যাও, কি করো সবই আমি দেখি।তুমি আগে যেমন চঞ্চলা ছিলে এখন ও তোমাকে তেমনটি দেখতে খুব ইচ্ছা করে। তুমি এখন এতো উদাসীনি হয়ে থাকো যে সেটা দেখে আমারও খুব কষ্ট হয়। আর অন্যরা যখন তোমাকে পাগলিনী বলে তখন ইচ্ছা করে আমিই তাদেরকে গিয়ে বলি, “আমার বাতাসী পাগলিনী নয় রে মাথামোটাগণ। তোমরা এই উদাসীনির মনের কথা বুঝতে পারো না এই যা। যদি সে পাগলিনী হয়েই থাকে তাহলে গত ফাল্গুনে হারুন মিয়ার মেয়েকে গোঁখরো সাপের হাত থেকে বাঁচালো কিভাবে? কিভাবে বৃদ্ধা জামিলা ফুফুর জ্বরের সময় রাতের পর রাত জেগে তার সেবা করেছিলো? কিভাবে শিউলি আপার ছেলেকে গ্রামের পুকুরে ডুবে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছিলো। তোমরা সে সবকিছু ভূলে গেলে নাকি…? যে মেয়েটা এতকিছু করলো আজ তোমরা তাকেই বলছো কি না পাগলিনী? তোমরা বড়ই অকৃতজ্ঞ রে, বড়ই আহাম্মক এর দল।” কিন্তু আমার অদৃশ্য থেকে বলা কথাগুলো তারা শুনতে পায় না। তাই আমি চাই আমার মনের কথাগুলো আমার হয়ে তুমিই তাদের বলবে।শুধু বলবে নয়, তুমি সেটা করে দেখাবে। বলো, বাতাসী তুমি এটুকু করতে…..?এমন সময় হঠাৎ সোনালী রবির কিরণ এসে পড়ে বাতাসীর চোখে-মুখে। এর সাথে তার ঘুমও ভেঙ্গে যায়। দেখে সে সারা শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। ঘামের সাথে সমান তালে ছুটছে তার দুচোখের নোনা জল। ঘাম আর অশ্রু মিলে একাকার হয়ে তার বুকের কাপর ভিজিয়ে দিলো।
তাই তো, আমার জীবরান আমাকে চঞ্চলা দেখতে কতই না ভালোবাসতো। আর আমি এখন এমন উদাসীনি হয়ে থাকি! না না, তা কি করে হয়।তাহলে যে এতে ওর আত্মাও কষ্ট পাবে। পারবোনা, আমি কিছুতেই আমার মনের মানুষ কে আর কষ্ট দিতে পারবোনা। যখন ও ছিল তখন অনেক দিয়েছি ওকে, আর না। ও যেভাবে বললো আমি সেভাবেই আবার নতুন করে আমার জীবনকে গড়ে তুলবো। নতুন করে স্বপ্ন সাজাবো আবার।আমি আর এমন উদাসীনি হয়ে পড়ে থাকবো না। থাকবো না।
কিন্তু মুখে বললেই কি আর সবকিছু হয়?কিছুক্ষণ পর মা তাকে চা, মুড়ি, আর বিস্কুট দিয়ে নাস্তা খেতে দিলেন। নাস্তা টা খেয়ে সে চাইলো একটু পড়তে বসবে। কিন্তু দশমিনিট এর বেশি সে আর পড়ার টেবিলে নিজেকে বসিয়ে রাখতে পারলো না। কোন অদৃশ্য শক্তি যেন তাকে টেনে নিয়ে গেলো খাদিমবাড়ির পুরানো বটগাছটির তলায়। ওমা, সেকি? জীবরানের সেই বাঁশিটি যে বটের একটি গহ্বরের ফাঁকেই রাখা আছে। বাতাসী কাঁপা কাঁপা হাতে সেই বাঁশিটা তুলে নিলো। তারপর একবার সরিষা ক্ষেত ও আরেকবার তেল চকচকে সেই নীলাঞ্জনা নদীটির পানে তাকিয়ে থেকে বাঁশিতে ঠোঁট বুলালো।আর সাথে সাথে উঠলো মায়াবী মোহিনী সুরের ঝর্ণা। সেই সুর ঢেউ তুললো সরিষা ক্ষেতে, বটগাছের প্রতিটি শাখায়। হঠাৎ করে বাতাসী মনে একটা অচেনা অজানা সুখ অনুভব করলো। তার মনে হলো এখনো জীবরান তার পাশেই আছে। হ্যাঁ, তাইতো! জীবরান তো স্বপ্নেই বলেছিলো সে সবসময় আমার সাথেই আছে এবং থাকবেও চিরকাল।। তাই হয়ত এখন আমি তাকে আমার পাশেই অনুভব করতে পারছি।সে সোনালি সরিষা ক্ষেতের পানে তাকিয়ে দেখে প্রতিটি সরিষা ফুলেই যেন জীবরানের ছবি ভেসে উঠেছে। বাঁশিটা হাতে নিয়ে দৌড়ে যায় সে নীলাঞ্জনার তীরে। দেখে সেখানেও পানির কলকল ধ্বনির মধ্যেও যেন জীবরানের কণ্ঠ ভেসে আসছে।আজ বাতাসীর সুখের সেই সোনালী দিনগুলো যেন আবার ফিরে এসেছে। এখনও ওর ভালোবাসার মানুষ জীবরান তার সাথেই আছে। একথা মনে করেই তার মনের দুঃখের সব আঁধার কেটে গিয়ে সুখের নতুন সূর্য উদীয়মান হলো।
তখনই বাতাসী ছুটে আসে বাড়িতে। আজ তার চোখে নেই কোন জল, মনে নেই কোন উদাসী ভাবমুর্তি। বাড়ির সবাই আজ তার এরকম উদাসীনি থেকে আচমকা পরিবর্তন হতে দেখে যতটা না অবাক হলেন তার চেয়ে বেশি খুশি হলেন এই ভেবে যে, মেয়েটার মলিন মুখে অন্তত আজ এতদিন পরে হাসির রেখা ফুটেছে। সে আবার হয়ে উঠেছে আগের মতো সেই হাসিখুশি চঞ্চলা বাতাসী।। না, তাদের ধারণা পুরোটা সঠিক নয়। সে হাসিখুশি হয়ে উঠেছে ঠিকই কিন্তু আগের মতো আর সেই চঞ্চলা মেয়ে নয়। সে এখন আর বড়বাড়িতে তেঁতুল কুড়াতে গিয়ে সময় নষ্ট করবে না। আর সেই নদীতটে শুভ্র কাশফুলও আনতে যাবে না। এখন সে করবে শুধুই লেখাপড়া। হ্যাঁ, তাকে পড়াশুনা করে অনেক বড় হতে হবে। একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হতেই হবে।জীবরানের শেষ স্বপ্নটা তাকে পূরণ করতেই হবে। নইলে সে জীবরানের কাছে কি জবাব দেবে?কারণ, জীবরান তো মরেনি, সে যে এখনও বেঁচে আছে। আছে বাতাসীর স্বপ্নিল অন্তরে, তার প্রেমিক হৃদয়ে।।।

x

Check Also

একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ বিশিষ্ট ব্যক্তি

সচিবালয় প্রতিবেদক : বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৮ সালের একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ বিশিষ্ট ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই পদকের জন্য মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ...

পুঠিয়ার প্রবীণ সাহিত্যিক আবদুল মজিদ মন্ডল আর নেই

পুঠিয়া প্রতিনিধি: রাজশাহীর পুঠিয়ার প্রবীণ কবি ও সাহিত্যিক আবদুল মজিদ মন্ডল আর নেই ইন্নাল্লিাহে…..রাজিউন। রবিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশাষ ত্যাগ করেন। ...

মুনাজাত

হায়াত মউত রিজিক দওলাত মাওলা সবি তোমার হাতে খালেক মালেক রহমান রাহীম তুমি কাদের গণি। তুমি ইলাহ তুমি রব তুমি আমার সব। আদর করে সোহাগ দিয়ে লালন কর তুমি। যা চাই তার সবটাই পাই যে ...

শিরোনামঃ