পরীক্ষামূলক প্রকাশনা - সাইট নির্মাণাধীন

Home > শিক্ষাঙ্গন > আ.লীগের দুই মেয়াদে রুয়েটে তিন ‘হাইব্রিড’ ভিসি!

আ.লীগের দুই মেয়াদে রুয়েটে তিন ‘হাইব্রিড’ ভিসি!

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মেয়াদে তিনজন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। যাদের মধ্যে দুইজন শিক্ষক হিসেবে পূর্বে বিএনপি-জামায়াতপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। নির্বাচন করেছেন জোটগতভাবে। অন্যজন ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রদলের নেতা। অথচ পট পরিবর্তনের পর তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেদের জাহির করে বাগিয়ে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাকর পদ। শুধু পদ বাগিয়ে নিয়েই থামেন নি; অনিয়ম-দুর্নীতি আর বিএনপি ও জামায়াত-শিবির তোষণ করেছেন রাখঢাক ছাড়ায়।

এদিকে এসব বিষয় নিয়ে ক্ষোভ আছে শিক্ষানগরীখ্যাত রাজশাহীতে অবস্থিত এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রগতিমনা প্রায় চার সহ¯্রাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর। তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষকদের বঞ্চিত করে হাইব্রিড শিক্ষকদের দায়িত্বে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে প্রগতিমনা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৮ মে বর্তমান ভিসি অধ্যাপক রফিকুল আলম বেগের মেয়াদকাল শেষ হচ্ছে। এরই মধ্যে রুয়েটের পরবর্তী ভিসি কে হচ্ছেন- তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষকরা বলছেন, ফের যদি দল পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি সেজে ‘হাইব্রিড’ কেউ ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান, তবে রুয়েটে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিপর্যের মুখে পড়বে। তাদের দাবি, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শিক্ষা এবং গবেষণা কাজে দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব সম্পন্ন প্রগতিমনা শিক্ষককে পদটির জন্য বিবেচনা করা হোক। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক এবং প্রশাসনিক কাজে জটিলতা ও অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়টির অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দেবেন এটাই তাদের আকাঙ্খা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. সিরাজুল করিম চৌধুরী। অথচ ২০০৩ সালে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতপন্থী প্যানেলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভোট করেন অধ্যাপক সিরাজুল। ২০০২ সালে তৎকালীন বিআইটি রাজশাহী ছাত্র সংসদে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ছাত্র উপদেষ্টার পদ পান তিনি। পট পরিবর্তনে হয়ে ওঠেন প্রতাপশালী আওয়ামী লীগার।

তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি বিএনপি ও জামায়াত-শিবির তোষণ শুরু করেন বলে অভিযোগ ওঠে। অপকর্ম করেও পার পেয়ে যান বিএনপি-জামায়াতপন্থী একাধিক শিক্ষক। কৌশলে ছাত্রলীগের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি করেন। সেই কোন্দলের বলি হন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল আজিজ। অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে খুন হন তিনি। এছাড়া বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে চাপে রাখতে শুরু করেন প্রগতিমনা শিক্ষকদের। সবশেষ পছন্দের এক শিক্ষার্থীর রেজাল্ট টেম্পারিংয়ের অভিযোগে দীর্ঘ চার মাসের আন্দোলনের মুখে তাকে অব্যাহতি দেয় সরকার।

এরপর তৎকালীন প্রোভিসি অধ্যাপক মর্ত্তুজা আলীকে ভারপ্রাপ্ত ভিসি নিয়োগ করা হয়। আশির দশকে বিআইটি’র ছাত্র থাকা অবস্থায় মর্ত্তুজা আলী ছাত্রদলের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ওই সময়ের তার শক্ত অবস্থান নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়, নিয়োগ পাওয়ার পর রুয়েটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দাওয়াত না দেওয়ায়। যা নিয়ে ক্যাম্পাসে তুমুল সমালোচিত হন ভিসি মর্ত্তুজা আলী। প্রথম থেকে ছাত্রলীগের সঙ্গে তাঁর দূরত্বের সৃষ্টি হয়। কিছুদিন পর ভিসির বিরুদ্ধে ছাত্র শিবিরকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা দেয়ার অভিযোগ ওঠে।

ছাত্রশিবির রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সাবেক সভাপতি আহসান হাবিবকে তিনি রুয়েটে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেন। নগরীর ভদ্রা আবাসিক এলাকায় শিবিরের সাবেক নেতা আহসান হাবিবের সাথে ড. মর্ত্তুজা আলী ফ্লাট নিমার্ণ করার অভিযোগ আছে। ২০১৪ সালে অধ্যাপক মর্ত্তুজার আমলে চারটি ডাটা প্রসেসর পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হলেও অবৈধভাবে ১০ জনকে নিয়োগ দেন। শহীদ সেলিম হলের হাড়িপাতিল চুরিতে অভিযুক্ত অধ্যাপক আশরাফুল আলমকে রেজিস্ট্রার এবং নারী কেলেংকারী ও মাদকাসক্ত অধ্যাপক কামরুজ্জামান রিপনকে ছাত্র কল্যাণ পরিচালকের পদে নিয়োগ দেন তিনি। যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলকে দেদারসে ঠিকাদারী কাজ পাইয়ে দেন ভিসি। এসব অনিয়ম তদন্তে ইউজিসি থেকে অধ্যাপক আতফুল হাই শিবলীকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠনও করা হয়। এছাড়া তিনি ১৯৯৩-৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জমায়াত জোট সরকারের সময় ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ২০১৪ সালের ২৮ মে অধ্যাপক ড. রফিকুল আলম বেগকে ভিসি নিয়োগ করা হয়। অধ্যাপক রফিকুল ২০০৩ সালের জুনে অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতপন্থী প্যানেল থেকে সহসভাপতি পদে নির্বাচন করেন। বিএনপি-জামায়াতপন্থী ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠন অ্যাব-এর প্রার্থী হয়ে রাজশাহী শাখার ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে ২০০৬-০৭ মেয়াদে নির্বাচন করে আওয়ামীপন্থী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর অধ্যাপক রফিকুল আলম উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগ বোর্ডসহ একাধিক কমিটির দায়িত্ব দেন বিএনপিপন্থী প্রভাবশালী শিক্ষক নেতা এবং অ্যাব নেতা ড. সৈয়দ আব্দুল মফিজকে। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিজ্ঞপ্তির একটি পদের বিপরীতে আটজন শিক্ষক নিয়োগ, এক পদের বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আটজন ডাটা প্রসেসর, ছয়জন বাজেট অফিসার, চারজন সেকশন অফিসার নিয়োগের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ভুয়া সনদ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থীরাও চাকরি পান।

২০১৭ সালে বিতর্কিত ঠিকাদার যুবদল নেতা ও রাবি শিক্ষক হত্যা মামলার আসামি আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলকে আড়াই কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেন ভিসি। নি¤্নমানের কাজ হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে ফের ৮০ লাখ টাকা বৃদ্ধি করা হয়। নিয়মবর্হিভূতভাবে ৫০ লাখ টাকার এলইডি টিভি ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালে ১৬ জুলাই সাড়ে ৬ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। জালিয়াতির ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অজ্ঞাত কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ভিসি নিজে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য কমিটিকে চাপ সৃষ্টি করে তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। এছাড়া বর্তমান ভিসির মেয়াদে রুয়েটে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। সবশেষ বাসচালক আব্দুস সালাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফলে ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক ভিসি অধ্যাপক সিরাজুল করিম চৌধুরী বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক না। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই আজিজ খুন হয়েছিলেন। আর আমার বিরুদ্ধে রেজাল্ট জালিয়াতির যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা মূলত আমাকে উপাচার্যের পদ থেকে সরানোর জন্যই এমনটি করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মর্ত্তুজা আলী বলেন, একটি মহল ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সাবেক উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে রুয়েটে ভিসি নিয়োগ দেয়া হবে, এ কারণেই ওই মহলটি এ ধরনের কাজে লিপ্ত রয়েছে। আর আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা সঠিক না।

আর বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ড. মোহা. রফিকুল আলম বেগ তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি- মেয়াদকাল শেষে নোংরা রাজনীতি করছে একটি পক্ষ। তিনি বিগত চার বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চেষ্টা করেছেন রুয়েটকে শিক্ষা ও গবেষণা কাজে এগিয়ে নিতে।

x

Check Also

একাদশে ভর্তি: যেভাবে চলবে কলেজ নিশ্চিতকরণ-মাইগ্রেশন-ভর্তি

একাদশ শ্রেণিতে (২০২০) ভর্তির জন্য প্রথম ধাপে ১২ লাখ ৭৭ হাজার ৭২১ জন শিক্ষার্থী মনোনীত হয়েছেন। বুধবার (২৬ আগস্ট) থেকে শুরু হয়েছে কলেজ নিশ্চিতকরণ। এরপর রয়েছে মাইগ্রেশন ও ভর্তির বিষয়। এসব ব‌্যাপারে বেশকিছু ধাপের কথা ...

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি’

করোনার কারণে এ বছর পিইসি বা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা না নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হলেও এখনো এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন। রোববার সাংবাদিকদের ...

একাদশে ভর্তির জন‌্য প্রথম ধাপে আবেদন সাড়ে ১৩ লাখ

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন‌্য প্রথম ধাপে আবেদন করেছে ১৩ লাখ ৪৩ হাজার শিক্ষার্থী। আবেদনের শেষ সময় ছিল বৃহস্পতিবার রাত ১২টা পর্যন্ত। শুক্রবার (২১ আগস্ট) ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক ড. ...

শিরোনামঃ